চেক ডিজঅনার
চেক ডিজঅনার হওয়া একটি অপরাধ ।
ডিজঅনার হওয়া চেকের বাহক একাউন্টধারী নিজে হলে সেটা কোন অপরাধ নয়। কিন্তু যদি এমন হয় যে একাউন্টধারী অন্য কাউকে চেক লিখে দিলেন এবং সেটি ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হল, তবে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল অ্যাক্টের ১৩৮ এবং ১৩৯ নম্বর ধারায় এ সংক্রান্ত ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান করা হয়। পরে ২০০০ এবং ২০০৬ সালে সংশ্লিষ্ট ধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
আইনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক:
চেক লেখার সময় থেকে ছয় মাস পর্যন্ত চেকটির মেয়াদ থাকে। তবে মেয়াদ শেষে একাউন্টধারী তারিখ কেটে পুনরায় তারিখ লিখে স্বাক্ষর করে মেয়াদ বাড়াতে পারেন। চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে একাউন্টধারীকে চেক ডিজঅনার হওয়ার বিষয়টি জানিয়ে চেকে উল্লিখিত অংকের টাকা প্রদানের দাবি জানাতে হয়। আর ত্রিশ দিনের মধ্যে দাবি না জানালে সেটি আইনের দৃষ্টিতে গ্রাহ্য হয় না। নোটিশ পাওয়ার ত্রিশ দিনের মধ্যে একাউন্টধারীকে টাকা পরিশোধ করতে হয়। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়।
যে ক্ষেত্রে কোন লোক তার দ্বারা পরিচালিত কোন ব্যাংক একাউন্ট হতে অন্য কোন লোককে যে কোন পরিমাণ অর্থ পরিশোধের জন্য কোন চেক দেয় এবং উক্ত একাউন্টে যদি চেক কাটা টাকার পরিমানের চেয়ে কম টাকা থাকে এবং চেকটি যদি ব্যাংক অপরিশোধিত অবস্থায় ফেরত দেয় তাহলে চেকদাতা একটি অপরাধ সংঘটিত করেছে বলে গণ্য হবে এবং তিনি এক বৎসর মেয়াদ পর্যন্ত দন্ডে দন্ডিত অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিনগুন পরিমাণ অর্থ দন্ডে দন্ডিত হবে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
উদাহরণ:
ধরা যাক ‘ক’ এর কাছে ‘খ’ দুই লাখ টাকা পাবে। ‘ক’ টাকা পরিশোধের উদ্দেশে ‘খ’ কে জনতা ব্যাংকের একটি চেক দিল। চেকে টাকার পরিমাণও ছিল দুই লাখ। ‘খ’ টাকা উত্তোলনের জন্য যথাসময়ে চেকটি জনতা ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর জনতা ব্যাংক জানিয়ে দিল ‘ক’ এর ব্যাংক হিসেবে পর্যাপ্ত টাকা নেই। তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ‘ক’ অপরাধ করেছে। তবে আইনের এ বিধানাবলী কার্যকর করতে কতিপয় শর্ত পূরণ করতে হবে।
নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮, ১৪০ ও ১৪১ ধারায় তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপরাধের জন্য আইনি প্রতিকারের বিধান রাখা হয়েছে।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট এ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী চেক ডিসঅনারের (dishonor) অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এ ধরনের মামলা নালিশের মাধ্যমে দায়ের করতে হয়।
চেক ডিজঅনারের বিভিন্ন কারণ:
(১) চেক প্রদানকারীর ব্যাংক একাউন্টে তহবিল/ অর্থ অপর্যাপ্ত থাকলে।
(২) যে ব্যক্তি চেক প্রদান করেছে তার স্বাক্ষরে মিল না থাকলে।
(৩) চেকে উল্লেখিত অর্থের অংক ও কথায় গরমিল থাকলে।
(৪) চেক এর মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে।
(৫) যথাযথভাবে চেক পূরণ করা না হলে।
(৬) চেকে কাটাকাটি বা ঘষামাজা করলে পূর্ণ স্বাক্ষর দিয়ে তা সত্যায়ন করা না হলে।
(৭) কোম্পানির ক্ষেত্রে চেকে করপোরেট সিল না থাকলে।
চেক নগদায়নের জন্য ব্যাংকে জমা দেবার সময় :
চেক ইস্যু করার তারিখ হতে ৬ মাসের মধ্যে অথবা এর বৈধতা বিদ্যমান থাকাকালীন সময়ের মাঝে যেটা আগে ঘটে এর মধ্যে চেক নগদায়নের জন্য উপস্থাপন করতে হবে।
চেক ডিজঅনার হলে মামলা করার পদ্ধতি:
১. নোটিশ প্রদান:
চেক গ্রহীতা চেক ডিজঅনারের বিষয় জানার পর হতে অর্থাৎ চেকটি অপরিশোধিত হয়ে ব্যাংক থেকে ফেরত আসার ৩০ দিনের মধ্যে ডিজঅনারের বিষয়ে চেক দাতাকে লিখিত নোটিশ দিয়ে টাকা পরিশোধ করার জন্য দাবি করতে হবে। নোটিশ চেকদাতাকে ব্যক্তিগতভাবে অথবা তার ঠিকানায় প্রাপ্তিস্বীকার পত্রসহ ডাক যোগে অথবা বহুল প্রচলিত বাংলা দৈনিকে প্রকাশের মাধ্যমে জারী করতে হবে।
২. মামলা দায়ের:
নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেক দাতা চেকে উল্লিখিত টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে তখন চেক গ্রহীতা মামলা করবে।
চেক ডিজঅনারের মামলা করার কারন উদ্ভব:
(১) চেক দাতার ডিজঅনারের নোটিশ প্রাপ্তির পর ৩০ দিন অতিবাহিত হলে এবং এর মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে মামলা করার কারন উদ্ভব হয়।
চেক ডিজঅনারের মামলা যে কোর্টে দায়ের করতে হয়ঃ
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে হয় তবে বিচারের ক্ষমতা দায়রা আদালতের।
চেক ডিজঅনারের মামলা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন এরিয়াতে হলে চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশের মাধ্যমে (সিআর) দায়ের করতে হয়। প্রথম শ্রেণীর জুডিসিয়াল বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারী কার্যবিধির ১৯০ (১) ধারা অনুযায়ী চেক ডিজঅনারের মামলা আমলে নিবেন। তারপর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অথবা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি প্রস্তুত করে বিচারের জন্য দায়রা আদালতে পাঠিয়ে দিবেন।
এ ধরনের মামলা দায়ের করতে যেসব তথ্য প্রয়োজন হয়:
১। চেক প্রদানকারীর নাম
২। চেক প্রদানের বা লেখার তারিখ
৩। চেক ডিজঅনার হওয়ার তারিখ
৪। ব্যাংক, ব্যাংকের শাখার নাম, হিসাব নম্বর, চেক নম্বর ও টাকার পরিমাণ
৫। কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চেক দেয়া হয়ে থাকলে ইস্যুকারী কর্মকর্তার নাম, পদবী ও প্রতিষ্ঠানের নাম।
৬। যে কারণে চেকটি ডিজঅনার করা হয়েছে।
৭। চেক ডিজঅনার হওয়ার কথা জানিয়ে নোটিশ পাঠানোর প্রমাণ এবং নোটিশ ফেরত এসে থাকলে ফেরত আসার তারিখসহ অন্যান্য তথ্য।
৮। চেক-লেনদেনের তথ্য।
চেক ডিজঅনার হলে শাস্তি বা জরিমানা:
(১) এক বছর পর্যন্ত কারাদন্ড।
(২) অথবা জরিমানা যা চেকে উল্লেখিত টাকার ৩ গুন।
(৩)অথবা উভয় দণ্ড।
আপীল দায়েরঃ
১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার মামলায় প্রদত্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে।
তহবিল অপর্যাপ্ততার কারণে ব্যাংক চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপরাধে আদালত কাউকে কারাদন্ড প্রদান করলে তার বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে প্রত্যাখ্যাত চেকের মূল্যের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অর্থ সংশ্লিষ্ট আদালতে জমা দিতে হবে।
১৩৮ ধারায় প্রদত্ত দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে দায়রা জজ অথবা হাইকোর্ট বিভাগে।
যদি ১৩৮ ধারায় চেক ডিসঅনারের মামলাটি যুগ্ম দায়রা জজ কর্তৃক বিচার করা হয় তাহলে ৩০ দিনের মাঝে দায়রা জজের নিকট আপীল দায়ের করা যাবে।
আপীল দায়েরের পূর্বশর্ত হলো:
১৩৮ক ধারায় উল্লেখ রয়েছে. আপীল আদালতে মামলা দায়ের করতে হলে প্রত্যাখ্যাত চেকের মূল্যের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অর্থ সংশ্লিষ্ট আদালতে জমা দিতে হবে।
চেক ডিজঅনার কারণে দেওয়ানি মামলা:
চেক ডিজঅনারের মামলা কিছুটা দেওয়ানী এবং কিছুটা ফৌজদারী প্রকৃতির। তাই চেক ডিজঅনার হলে চেক গ্রহীতা তার টাকার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য দেওয়ানী আদালতেও মামলা দায়ের করতে পারবে। সাধারণত ১৩৮ ধারায় ফৌজদারি মামলা করার সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৭ আদেশের ১-৭ বিধিতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে এরকম বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে মামলা পরিচালনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বিবাদীকে এক্ষেত্রে লিখিত জবাব দাখিল করতে হয় না।

Post a Comment