Header Ads

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা



মানসিক রোগ প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমে জানতে হবে মানসিক রোগ কি এবং কিভাবে হয়? মানুষের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, বৃক্ক ইত্যাদি রোগ হয় তেমনি মনের বিভিন্ন অঙ্গে যেমন আবেগ, চিন্তা, অনুভূতি ও মেমোরি লস রোগ হতে পারে। 

কোন ব্যক্তির যদি চিন্তার পরিবর্তন, আবেগ - অনুভূতির পরিবর্তন, স্মৃতি বৈকাল্য, প্রত্যক্ষণ,  বিচার বিশ্লেষণ ও বুদ্ধি বিবেচনার পরিবর্তন ঘটে এবং তা তার কথাবার্তায় ও আচার-আচরণে প্রকাশ পায় তবে তাকে মানসিক রোগে আক্রান্ত বলে মনে করা হয়। এ ধরনের আচারণগত পরিবর্তনের কারনে তার আশপাশের লোকজন উত্ত্যক্ত হয় ও জ্বালা যন্ত্রণা ভোগ করে। তার আচরণের পরিবর্তন যদি তার দৈনন্দিন কাজকর্মে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কর্মক্ষেত্রে কাজের অনিয়ম ঘটায়, তার নিদ্রার পরিবর্তন আনে, চারপাশের লোকজনের সাথে মেলামেশার ব্যাঘাত ঘটায় অর্থাৎ সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতি সাধন করে তবে তা মানসিক রোগের লক্ষণ। মানসিক রোগ মূলত দুই ধরনের যা ১) গুরুতর মানসিক রোগ যেমন: সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্ণতা, স্মরণশক্তি লোপ, ব্যক্তিত্ব ব্যাধি, চিত্ত বিভ্রমন/ মানসিক বিকার।  ২) লঘু মানসিক রোগ যেমন: উদ্বেগাধিক্য ব্যাধি, অহেতুক ভীত, হিস্টিরিয়া।  

মানসিক রোগের লক্ষণসমূহঃ
১) ব্যবহার বা আচরণ সমস্যাঃ রোগীর আচরণে অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পায় এবং সে উল্টা- পাল্টা ব্যবহার শুরু যা সাধারণভাবে করত না। তার এই সব অদ্ভুত আচরণে পরিবারের লোকজন বিরক্ত বোধ করে এবং বাইরের লোকের সামনে বিব্রত বোধ করে। অনেক সময় এমন সব আচরণ প্রকাশ পায় যা সেই রোগী এবং তার আশপাশে সবার জন্য হুমকিস্বরূপ। রোগী অস্থিরভাবে চলাফেরা করে, চঞ্চল হয়ে পড়ে এবং উদ্ভান্তের মতো উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। অনেক সময় লোকজনকে বিনা কারণে গালমন্দ করতে থাকে কখনও বা সামান্য কারণে অথবা বিনা করণে তাড়া করে। অন্যদিকে কোন মানসিক রোগী অত্যন্ত স্থবির হয়ে পড়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মতৎপর থাকে না। এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে অথবা শুয়ে থাকে, নড়তে চড়তে চায় না। আহার, নিদ্রার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও অনীহা প্রকাশ করে। কখনও কখনও কিছু কিছু রোগী কৌতুহল উদ্দীপক আচরণ প্রকাশ করে থাকে যা দেখে আত্মীয় - স্বজন উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়।
২) কথোপকথন (চিন্তা-ভাবনা)ঃ মানসিক রোগগ্রস্ত রোগীদের মধ্যে কেউ বেশী কথা বলে, কেউ অমূলক কথাবার্তা বলে। অনেকে একদম কম কথা বলে। আবার কিছু রোগী আছে যারা বাকরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। অনেক রোগীর কথা অসংলগ্ন এবং বোধগম্য নয়। তারা অদ্ভুত অলীক ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের কথাবার্তা বলে যা তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের একই ধর্ম ও সমাজ বিশ্বাসের লোকেরা বলে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনেক সময় রোগী বলে যে, তার শত্রুরা বিষাক্ত গ্যাস তার ঘরের মধ্যে পাম্প করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাকে মেরে ফেলার জন্য, হাজার হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকা তার চামরার নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাকে যেসব খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে তার মধ্যে বিষ মেশানো আছে।
৩) ভাবাবেগঃ রোগী পরিবেশের তুলনায় অধিক অথবা অপ্রাসঙ্গিক ভাবাবেগ প্রকাশ করতে পারে। এমনও দেখা যায় তার আদৌ কোন ভাবাবেগের পরিবর্তন হয়নি। সে মূর্তির মতো স্থির বসে থাকতে পারে, অনেক সময় একাকী কাঁদে অথবা বিনা কারণে হাসে।
৪) প্রত্যক্ষণঃ রোগীর পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রাহ্য প্রত্যক্ষণের পরিবর্তন হতে পারে। সে চোখে ভ্রম দেখতে পারে। সে অনেক সময় গায়েবি আওয়াজ শোনে, কখনও বা তাকে কেউ মারতে, কাটতে আসছে এ রকমও দেখে থাকে। মানসিক রোগীরা অনেক জিনিস দেখতে পায় যা সুস্থ লোকেরা দেখে না, অনেক কিছু শুনে থাকে যা অন্যেরা শোনে না। ত্বকে অদ্ভুত ধরনের স্পর্শ বোধ হয়। ফলে বাইরের অনুকরণ ছাড়াই তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়তে প্রত্যক্ষণ হতে পারে যাতে আমরা হ্যালোসিনেশন বা অলীক প্রত্যক্ষণ বলে থাকি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সে যদি গালমন্দেও অলীক শব্দ শ্রবণ করে, তবে সে অদৃশ্য ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বকাঝকা শুরু করে তাকে হুমকি দেয়। যদি তার চোখে অলীক বস্তুর প্রত্যক্ষণ হয় তবে সে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লোককে তাড়া করতে পারে। অলীক শ্রবণ প্রত্যক্ষণের রোগী নিজে কথা বলে, হাসে, কাঁদে, রাস্তার যত্রতত্র হাঁটতে থাকে, তর্কে অবতীর্ণ হয় অথবা অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে।
৫) স্বরণশক্তিঃ মানসিক রোগীর স্মরণশক্তি বৈকাল্য ঘটতে পারে এবং তার অনেক মূল্যবান কথাবার্তায় ভুল হতে পারে। একটু আগে কি দেখেছে, শুনেছে বা অভিজ্ঞতা লাভ করেছে সব ভুলে যায়। নিজের ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন- কলম, ঘড়ি, চশমা, ছাতা কোথায় রেখেছে মনে করতে পারে না। কয়েকদিন পূর্বে কত টাকা লেনদেন করেছে এবং কার কার সাথে দেখা-সাক্ষাত হয়েছে স্মরণ করতে পারে না। রোগী তার পুরনো স্মৃতি ভুলে যেতে পারে। এমনকি তার ছেলেমেয়েদের কার কি নাম, তার ভাইবোন কে কোথায় আছে সেগুলোও ভুলে যায়। চেনা রাস্তাঘাটে চলতে যেয়ে পথ হারিয়ে ফেলে।
৬) বুদ্ধিমত্তা ও বিচার ক্ষমতাঃ কিছু কিছু মানসিক রোগের বুদ্ধিমত্তা ও কাজকর্মে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয় বা এগুলো লোপ পায়। রোগীর বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা কমে যায়। সে তার দৈনন্দিন কাজকর্মে ভুল করে এবং বোকা লোকদের মতো আচরণ করে থাকে। অনেকে ব্যক্তিগত জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যা তার নিজের ও অন্যের ক্ষতি বয়ে আনে। অনেক সময় তার সামনে একজন বাচ্চা রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছে এবং আঘাত পাচ্ছে দেখেও চুপচাপ থাকে।
৭) চেতনাশক্তিঃ অনেক সময় মস্তিষ্কের প্রদাহ বা বৈকাল্যের ফলে তার চেতনারশক্তির পরিবর্তন হয়। রোগী তার আত্মীয়স্বজনকে চিনতে পারে না, সময় স্থান সম্বন্ধেও জ্ঞান থাকে না।
মানসিক রোগ প্রতিরোধের উপায়ঃ
⛔বাচ্চাদের বেড়ে উঠার সময় তার সামাজিক ও মানসিক বৃদ্ধির দিকে খেয়াল করা।
⛔সমাজ থেকে, পরিবার থেকে ঝগড়া, কলহ, মারামারি কমানো।
⛔মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
⛔পরিবারের সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অর্থাৎ কোন সমস্যা হলে সবার সাথে সেয়ার করে তার সমাধান করা।
⛔মানসিক চাপ মুক্ত থাকা।
⛔বিষণ্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
⛔পরিবারের সবাইকে বুঝানো কিভাবে পরিবারের কারণে মানসিক রোগ বৃদ্ধি পায়।

মানসিক রোগ হলে যত তারাতারি সম্ভব মনোবিজ্ঞানী অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ভয়ের কোন কারণ নাই চিকিৎসা নিন সুস্থ থাকুন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.